২৪শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৯ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

প্রচ্ছদ সারা বাংলা ময়মনসিংহে লবন গুজবে ১২জনের জরিমানা ॥ ৪জন গ্রেফতার ব্যবসীয়দের সাথে ডিসি এসপি’র মতবিনিময় ॥ মজুত পর্যাপ্ত ॥ নির্ধারিত মুল্যের বেশি দরে না কিনতে আহবান
১৯, নভেম্বর, ২০১৯, ১১:১৫ অপরাহ্ণ -

তথ্যপ্রতিদিন. কমঃ

লবন প্রতিটি মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় একটি দ্রব্য। কারখানার মাধ্যমে উৎপাদিত একমাত্র পণ্য এই লবন সমস্ত মানুষের চাহিদা পুরণ করে বিদেশেও রপ্তানী করে আসছে বাংলাদেশ। সারাদেশে পর্যাপ্ত মজুতের পাশাপাশি ময়মনসিংহের পাইকারী ও খুচরা বাজারে পর্যাপ্ত রয়েছে। এর পরও একটি চক্র সোমবার রাত থেকেই লবনের দাম চড়া, বাজারে পাওয়া যাবেনা এমন অদ্ভুত আতংক প্রচার করে বাজারে কৃত্তিম সংকট সৃষ্টির চেষ্ঠা করে। মঙ্গলবার লবন নিয়ে শহরের ছোট বাজার এলাকায় (পাইকারী বাজার) লবন গুজবে মানুষের ভীড় আর উৎকন্ঠা দেখা দেয়। মানুষ লবন কিনতে দোকানে দোকানে হণ্যে হয়ে ছুটতে থাকে। কোন কোন দোকানে লবনের জন্য লম্বা লাইন পড়ে যায়। এরই মাঝে নানা উড়ো খবর আসে এই বাজার নয়, সেই বাজারে একশত থেকে দু’শত টাকা কেজি দরে লবন বিক্রি হচ্ছে। এর কোন সত্যতা না থাকলেও জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন পেয়াজের ন্যায় লবন যেন মানুষের কষ্টদায়ক পণ্য হয়ে না উঠে তার জন্য আগেভাগেই মাঠে নামে।

অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ ১৬ জনকে জরিমানা ও গ্রেফতার করে।
লবন নিয়ে তুলকালামকান্ড ঘটানোর খবরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ব্যবসায়ীদের সাথে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রবাদির বাজারদর সংক্রান্তে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ পৃথক মতবিনিময় করে।
জেলা প্রশাসক মোঃ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক একেএম গালিব খান, এনএসআইয়ের যুগ্ন-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনুর রশিদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর আলম (সার্বিক), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিা) সমর কান্তি বসাক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজুল ইসলাম, সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্র্যাট রাজিব উল হাসানসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেনের সভাপতিত্বে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির বাজার দর সংক্রান্তে ব্যবসায়ীদের সাথে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে মতবিনিময় সভা হয়। সভায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির, জয়িতা শিল্পী, হাফিজুল ইসলাম, আল আমিন, ডিবির ওসি শাহ কামাল আকন্দ, কোতোয়ালী মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকার শাকের আহমেদ, ডিআইওয়ান মোখলেছুর রহমান আকন্দসহ অন্যন্যা কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দরা বলেন, লবনের পর্যাপ্ত মজুত আছে। এছাড়াও লবন কেনা রয়েছে। যা ইতিমধ্যেই ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে আসা শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা প্রশাসনকে অবহিত করেন, এসিআই লবন ১ কেজি ওজনের ২৫ প্যাকেটের বস্তা ৬৩০ টাকা, আধা কেজি ওজনের ৫০ প্যাকেটের বস্তা ৬৫৫ টাকা, যা খুচরা বাজার মূল্য এক কেজি ৩৫ টাকা, আধা কেজি ১৮ টাকা, কনফিডেন্স ৬০০টাকা, আধা কেজির একই পরিমাণের বস্তা ৬৪৫ টাকা এবং ৩৫ টাকা কেজি ও আধা কেজি ১৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফ্রেশ লবন ঐ পরিমাণের বস্তা ৬০০ টাকা, আধা কেজির ৫০ ফ্যাকেটের বস্তা ৬১০ টাকা, খুচরা ২৮ টাকা কেজি ও আধা কেজি ১৪ টাকা। এছাড়া পুবালী (চিকন) ৫৮০ টাকা এবং ৫০০ টাকা। কেজি দরে ৩৫ টাকা ও আদা কেজি ১৮ টাকা। পুবালী মোটা ৩৩০ টাকা ও ৩৪০ টাকা। কেজি প্রতি ২৮ টাকা ও আধা কেজি ১২ টাকা। বাধুনী মোটা ৩৩০ টাকা । কেজি প্রতি ৩০ টাকা ও আধা কেজি ১৫ টাকা। এছাড়া বিএমসি (চিকন) ৬২০ টাকা ও ৬৪০ টাকা। কেজি প্রতি ৪০ টাকা ও আধা কেজি ২১টাকা।
ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া তথ্যের সুত্র ধরে জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান বলেন, প্রশাসন কারো মাথা ব্যথার কারণ হতে চায় না। মিলে মিশে চলতে চাই। প্যাকেটের গায়ের লেখা মূল্য তালিকা অনুযায়ী সকল পণ্য বিক্রি করতে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি নিশ্চিত করতে ব্যাপক আকারে প্রচার করার দাবী করে আরো বলেন, যে কোন ধরণের গুজব উড়িয়ে দিতে সমভাবে কাজ করতে চাই। এ জন্য ব্যবসায়ীরা সকল ধরণের সহযোগীতা করতে সব সময় প্রস্তুত বলেও নেতৃবৃন্দ জানান।
এর আগে পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন মতবিনিময়কালে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, হুজুকে পড়ে পরবর্তী সময়ে অনুতপ্ত হওয়ার চেয়ে আগেই জেনে বুঝে কাজ করা ভাল। শুনা কথায় আন্দাজের উপর নির্ভর করা ঠিক হবে না। একটি চক্র দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে গুজবের ফাঁদ পেতে চলছে। ওদের ফাতানো ফাঁদে পা দিয়ে ব্যবসায়ীসহ অনেকেই তিগ্রস্থ হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীরা তিগ্রস্থ হচ্ছে। কেনাবেচাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, প্রশাসন ও আইন শৃংখলা বাহিনী কাউকে হেনস্থা করার উদ্দেশ্যে নজরদারী করছেনা। গুজব রটিয়ে কেউ যাতে অন্যায়ভাবে লাভবান হতে না পারে তার জন্য নজরদারী ও মনিটরিং করা হচ্ছে। তিনি ব্যবসায়ীদের আরো বলেন, তথ্য বিনিময় হলে ব্যবসায়ীদের সাথে প্রশাসনের ভুল বোঝাবুঝি হবেনা। বরং সত্য বিষয়টি বের হলে দেশবাসি শান্তিতে থাকবে।
এর আগে লবনের দাম বেড়ে যাচ্ছে, লবন পাওয়া যাচ্ছেনা। লাইনে ক্রেতাদের ভীড়, বিভিন্ন দোকানে ভিন্ন দরে লবন বিক্রি হচ্ছে এ ধরণের খবরে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ মাঠে নামে। ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার আশ আবিদ হোসেনসহ বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি পুলিশ প্রকাশ্য মাঠে নামে। এছাড়া জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার ভুমি, ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে পৃথক টিম সহ গোয়েন্দা বিভাগ, ডিবি পুলিশ মাঠে নামে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা ও থানা পুলিশ পৃথকভাবে মাইকিং করে। এছাড়া প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী তাদের নিজস্ব ফেইজবুক পেইজে লবনের পর্যাপ্ত মজুত থাকা, পাইকারী ও খুচরা পর্যায়ে দাম বৃদ্ধি না হওয়া এবং প্যাকেটের গায়ে লেখা মুল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মুল্যে লবনসহ কোন পণ্য না কিনতে সকলের প্রতি আহবান জানানো হয়। অপরদিকে লবনসহ কোন পণ্যে কারসাজি, চড়া দামে বিক্রির চেষ্টাসহ আতংক ছড়ানোর চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার এবং অতিরিক্তি দামে না কিনতে জেলার বিভিন্ন মসজিদের মাইকে প্রচার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জেলা পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, লবনকান্ডে গুজব, অতিরিক্ত দামে বিক্রির সাথে জড়িত ১৬ জনকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার ও জরিমানা করা হয়েছে। কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশ পরাণগঞ্জ শাহ বাজারে অভিযান পরিচালনা করে চারজন এবং গফরগাওয়ে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সদরের গ্রেফতারকৃতরা হলো, নুরুল ইসলাম, আবু ইউসুফ, সজুল সাহা ও নিতাই সাহা এবং গফরগাওয়ের জাহাঙ্গীর ও সোহাগ। এছাড়া নান্দাইলে সিরাজুল ইসলাম, মোসলেম উদ্দিন, জুটন সাহাকে ৫ হাজার করে এবং রিপন মিয়াকে সাত হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ঈশ্বরগঞ্জে হযরত আলীকে ৪০ হাজার ও এনামূল হককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ধোবাউড়ায় আক্তার হোসেনকে ১৫ হাজার, আবু বকরকে ২ হাজার ও মামুনকে ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এদিকে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার পৃথকভাবে মতবিনিময়কালে দাবী করেন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশের নজরদারী অব্যাহত থাকবে।